মহাবিশ্বের জ্যামিতিক গঠন সমতল কেন ?

                             

আমাদের এই মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিলো বিগ ব্যাং দিয়ে। তাই আমরা দেখতে পাই বেশিরভাগ ছায়াপথ সব দিক থেকে আমাদের থেকে দূরে সরে চলেছে । সত্যই আকর্ষণীয় বিষয়! বিগ ব্যাং এর অর্থ দাঁড়ায় কোটি কোটি বছর আগে সবকিছুই একসাথে ছিল।  কিন্তু সবার আগ্রহের বিষয় হলো কি ভাবে মহাবিশ্বের শেষ হবে? এটি কি চিরকাল চলতে থাকবে? ছায়াপথগুলি কি শেষ পর্যন্ত ধীর হয়ে যাবে, থেমে যাবে এবং মহাসংকোচনের মাধ্যেমে আবার একত্রিত হবে ? আমরা কি সর্বদা এবং চিরকাল বিগ ব্যাং এর একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রসারণ-সংকোচন- প্রসারণ-সংকোচন এমন চক্র পাব? উওর হলো না। কারন, বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মহাবিশ্ব সমতল হওয়ায় এটি কখনও নিজেই সংকুচিত হবে না এবং আবার বিগ ব্যাং শুরু করবে না। 


মহাবিশ্ব সমতল জ্ঞাত হলেও সবচেয়ে বড় বিষয়টি এখনো আমাদের অজানা। আমরা এখনও জানি না মহাবিশ্ব সীমাবদ্ধ না অসীম। 
চিত্রঃ বিগ ব্যাং তত্ব; একক বিন্দু থেকে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে।(Credit: grandunificationtheory.com)  

তাহলে, মহাবিশ্ব "সমতল" এর অর্থ কী? কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমরা কীভাবে জানি মহাবিশ্ব সমতল? মহাবিশ্বের সমতল আকৃতি সম্পর্কে বলার আগে, সাধারণভাবে সমতল বিষয়টি নিয়ে কথা বলা দরকার।
আপনি যদি বর্গাকার ঘরের একটি কোণে থাকেন এবং ঘরটির বাকি কোণগুলি ঘুরে দেখেন। তাহলে, আপনি চারটি ৯০ ডিগ্রি বাঁক তৈরি করে আপনার শুরুর অবস্থানে ফিরে যাবেন। তখন বলতে  পারবেন ঘরটি সমতল। এটি ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি।যদি আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠে একই রকম ভ্রমণ করতে চান, তাহলে নিরক্ষীয় স্থান থেকে শুরু করে ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিলে উত্তর মেরুতে চলে যাবেন।  আরও ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিলে, নিরক্ষীয় অঞ্চলে ফিরে আসবেন। অন্য আরেকটি ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিলে আপনার প্রারম্ভিক স্থানে ফিরে আসবেন। প্রথম পরিস্থিতিতে প্রারম্ভিক বিন্দুতে ফিরে আসতে চারটি বাঁক নিতে হবে,অপর পরিস্থিতিতে মাত্র তিনটি নিলেই হবে। কারণ আপনি যে পৃষ্ঠের উপরে হাঁটবেন  তার জ্যামিতিক আকৃতি সিদ্ধান্ত নেয় ৯০-ডিগ্রি মোড় নেওয়ার পরে কি ঘটবে?


   
চিত্রঃ সমতল বর্গাকার ঘরের এক কোণ থেকে যাত্রা শুরু করে আবার চারটি ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিলে প্রাথমিক স্থানে ফিরে আসা যায়। একইভাবে, গোলাকার পৃথিবীর জন্য তিনটি বাঁক নিতে হয়।  

আরও একটি চরম উদাহরণ কল্পনা করি। ধরুন,আপনি কোনো গর্তের ভিতরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখন যাত্রা বিন্দুতে ফিরে আসতে চারটির বেশি বাঁক নিতে হবে। 

আবার পৃথিবীর উত্তর মেরুবিন্দু থেকে উৎপন্ন দুটি সমান্তরাল রেখা কল্পনা করি। সমান্তরাল রেখা দুটি পৃথিবীর জ্যামিতিক আকৃতি অনুসরণ করে একে অপরের থেকে দূরে সরে যায় এবং আবার একত্রিত হয়। 
এখন মহাবিশ্বের কথা চিন্তা করে একই উপমা প্রয়োগ করা যেতে পারে। এবার কোটি কোটি আলোকবর্ষ ধরে রকেটের মহাকাশে উড়ে বেড়ানোর চিত্র কল্পনা করা যাক। যদি রকেটটি ৯০ ডিগ্রির বাঁকগুলি নিয়ে আবার শুরুতে ফিরে আসে। তবে তিন বা পাঁচটিতে এটি ফিরতে পারবে না, ঠিক চারটি বাঁক দরকার হবে। যার অর্থ মহাবিশ্বের টপোলজি তথা জ্যামিতিক আকার সমতল। যা সম্পূর্ণ স্বজ্ঞামূলক, তাই না? কারন, কোনো সরাসরি যুক্তি প্রমাণ ছাড়াই আমরা সমতল হওয়াটাকে সত্য বলে অনুভব করছি। 


এই মহাজাগতিক বেতারতরঙ্গ পটভূমি বিকিরন মহাবিশ্বের জ্যামিতিক আকৃতি তথা টপোলজি তৈরীতে ভূমিকা রেখেছে। মহাবিশ্ব যদি কোনো উপায়ে বাঁকা হয়ে থাকত, তবে আমরা আজ যে কাঠামোগুলি দেখি তার প্রকৃত আকারের তুলনায় এই তাপমাত্রার বিভিন্নতা বিকৃতরুপে প্রদর্শিত হত।

তাই জ্যোতির্বিদরা এ ব্যাপারে সন্দেহজনক ছিলেন। তাদের নিশ্চিত হতে সরাসরি প্রমাণের দরকার ছিল এবং তাই তারা এই অনুমানটি পরীক্ষা করার জন্য অনেক আগে থেকেই চেষ্টা শুরু করেছিলেন।   

চিত্রঃ মহাজাগতিক বেতার তরঙ্গ বিকিরন (Cosmic microwave background radiation-CMBR) Credit: NASA

মহাবিশ্বের সমতল আকৃতি প্রমাণ করার জন্য জ্যোতির্বিদদের অনেক দীর্ঘ চেষ্টা করতে হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের পক্ষে তৈরী করা সম্ভব এমন সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করেন। তারা মহাবিশ্বের মহাজাগতিক বেতারতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ নিয়ে পর্যবেক্ষন ও গবেষণা শুরু করেন।মহাবিশ্বের মহাজাগতিক বেতারতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ হলো বিগ ব্যাং এর পর পরই সৃষ্ট তড়িৎ চুম্বকীয়  বেতার তরঙ। এই বিকিরণ মহাবিশ্বে ক্ষীণ হয়ে এখনো বিরাজ করছে। বিগ ব্যাং এর পরের  আলোকসজ্জা যা সব দিকে লাল অপসারন হিসাবে দেখা যায়। বিকিরণটি প্রকাশিত হওয়ার প্রক্কালে পুরো মহাবিশ্বের তাপমাত্রা প্রায় 2,700 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ছিল। এই মুহুর্তটি শেষে আলোক কণার  মহাবিশ্ব জুড়ে বিচরণ করতে পারার জন্য যথেষ্ট শীতল ছিল। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এই আলোক কণাগুলির ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ভ্রমনকে প্রসারিত করেছিল এবং পরম শূন্যে তাপমাত্রার মাত্র ২.৭ ডিগ্রি উপরে মাইক্রোওয়েভ বর্ণালীতে রুপান্তরিত করে।  


মহাবিশ্ব যদি বক্র হয় তবে চারের চেয়ে কম বাঁক নিয়ে আগের অবস্থানে ফিরে আসা যাবে। এর অর্থ হল, মহাবিশ্ব হবে বদ্ধ প্রকৃতির এবং সংকোচনমূখী গন্তব্যের। আর যদি চারের অধিক বাঁক নিতে হয় তবে মহাবিশ্ব হবে মুক্ত প্রকৃতির এবং চিরকাল প্রসারণমূখী গন্তব্যের ।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা  সহজলভ্য সবচেয়ে সংবেদনশীল মহাকাশ-ভিত্তিক টেলিস্কোপ দ্বারা, পটভূমি বিকিরণের তাপমাত্রার ক্ষুদ্র ক্রমাগত পরিবর্তনও সনাক্ত করতে সক্ষম হন। এই ক্ষুদ্রাকৃতির তাপমাত্রার বিভিন্নতা পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বৃহত্তম স্কেল কাঠামোর সাথে মিলে যায়।  ডিগ্রি তাপমাত্রার গ্নাংশ নিয়ে থাকা অঞ্চল, কয়েক মিলিয়ন আলোক-বছর জুড়ে একটি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে পরিণত হয়।
এই মহাজাগতিক বেতারতরঙ্গ পটভূমি বিকিরন মহাবিশ্বের জ্যামিতিক আকৃতি তথা টপোলজি তৈরীতে ভূমিকা রেখেছে। মহাবিশ্ব যদি কোনো উপায়ে বাঁকা হয়ে থাকত, তবে আমরা আজ যে কাঠামোগুলি দেখি তার প্রকৃত আকারের তুলনায় এই তাপমাত্রার বিভিন্নতা বিকৃতরুপে প্রদর্শিত হত।


চিত্রঃ যদি এই মহাবিশ্ব অসমতলীয় হত তবে চলতি মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের পর্যবেক্ষিত মহাজাগতিক বেতার তরঙ্গ বিকিরন ডেটার বিকৃতি পরিলক্ষিত হত। (Credit: NASA/ WMAP Science Team ) 

মহাবিশ্ব সমতল মানে দুটি সমান্তরাল রেখা সর্বদা সমান্তরাল থাকবে। রেখা দুটি কখনই মিলিত হবে না।  
দুর্ভাগ্যক্রমে, মহাবিশ্ব সমতল জ্ঞাত হলেও সবচেয়ে বড় বিষয়টি এখনো আমাদের অজানা। আমরা এখনও জানি না মহাবিশ্ব সীমাবদ্ধ না অসীম। যদি মহাবিশ্বের বক্রতা পরিমাপ করতে পারা যায়, তবে বলতে পারব যে আমরা একটি সীমাবদ্ধ মহাবিশ্বে আছি। পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বাইরেও আমরা পরিমাপ করতে পারব এবং এর প্রকৃত আকারটি কী তা উপলব্ধি করতে পারব। 

আগে সৃষ্টিতত্ববিদেরা বলত মহাবিশ্ব যে সমতল এর প্রভাব ভবিষ্যতে পড়বে। মহাবিশ্ব যদি বক্র হয় তবে চারের চেয়ে কম বাঁক নিয়ে আগের অবস্থানে ফিরে আসা যাবে। এর অর্থ হল, মহাবিশ্ব হবে বদ্ধ প্রকৃতির এবং সংকোচনমূখী গন্তব্যের। আর যদি চারের অধিক বাঁক নিতে হয় তবে মহাবিশ্ব হবে মুক্ত প্রকৃতির এবং চিরকাল প্রসারণমূখী গন্তব্যের ।

 চিত্রঃ অদৃশ্য শক্তি যা মহাকর্ষকে কর্তৃত্ব করছে ( সবুজ গ্রিড) (Credit: NASA/JPL-Caltech) 

১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা অদৃশ্য শক্তি বা ডার্ক এনার্জি আবিষ্কার করেন। যা আশ্চর্যজনকভাবে মহাবিশ্বের প্রসারণকে দ্রুততর করছে। এই মহাবিশ্ব মুক্ত বা বদ্ধ , সমতল বা বক্র যাই হোক না কেন , এটি প্রসারিত হচ্ছে। এই প্রসারন চিরকাল ধরে দ্রুততর হতে যাচ্ছে।
আমি আশা করছি, মহাবিশ্ব সমতল বলতে আসলে কি বোঝায় লেখাটি থেকে সেই বোধগম্যতা কিছুটা আসবে। আসলে, বেতার তরঙ্গের পটভূমি বিকিরণ থেকেই মহাবিশ্ব সমতলের ধারনাটি প্রমানিত।  


                          Video Credit: Fraser Cain 
          

   
উৎসঃ www.phy.org 

No comments

Theme images by JacobH. Powered by Blogger.